নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নারীর নিয়োগ নিয়ে যত মত news

0
45
news

নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগবঞ্চিত আয়েশা সিদ্দিকার আইনজীবী, তাঁর জায়গায় news নিয়োগপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার সেকেন্দার আলীর পক্ষের আইনজীবী ও আদালত দুটি বিষয়ে একমত। বাংলাদেশের সংবিধান নিশ্চিত করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমানাধিকার আছে এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইনের কোথাও বলা নেই যে নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ পেতে পারবেন না।

তারপরও আয়েশা সিদ্দিকাকে যে প্যানেল নিয়োগের সুপারিশ করেছিল, সেই প্যানেল বাতিল করে news আইন মন্ত্রণালয় চিঠি দেয়। আদালত বলেছেন, সেই চিঠি ঠিক ছিল। বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের দেওয়া রায়টি প্রকাশ হওয়ার পর এই ইস্যুতে নানামুখী আলোচনার সূত্রপাত হয়।

একটি পক্ষ আদালতের রায়কে সঠিক বলে মন্তব্য করছে। আবার একটি পক্ষ বলছে, ঐতিহাসিকভাবে কাজি বা নিকাহ নিবন্ধকের পদটা পুরুষেরা কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাদের চক্রান্তে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগে বাধা দিয়েছে। কেউ বলছেন, ‘শারীরিক অযোগ্যতা’র ধুয়া তুলে নারীদের নিকাহ রেজিস্ট্রারের পদে নিয়োগ না দেওয়ার অর্থ সংবিধান ও আইনের লঙ্ঘন।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগবঞ্চিত news আয়েশা সিদ্দিকা ও তাঁর আইনজীবীরা আপিল করেছেন। ৪ এপ্রিল আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাইকোর্টের ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তিতে সরগরম ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

মুসলিম রীতিতে বিয়ে যেভাবে

ইসলামিক ফাউন্ডেশন মনোনীত মুফতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ইজাব ও কবুল হলো মুসলিম বিয়ের ভিত্তি। ইজাব অর্থ প্রস্তাব দেওয়া, কবুল অর্থ প্রস্তাবে সম্মত হওয়া। দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে এই ইজাব ও কবুল হলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। এরপর দোয়া বা খুতবা পড়াসহ আনুষঙ্গিক যে বিষয়গুলো সেগুলো অপরিহার্য নয়, সুন্নত। প্রাপ্তবয়স্ক যেকোনো মুসলিম বিয়ে দেওয়ার কাজটি করতে পারেন।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪-এ নিকাহ রেজিস্ট্রারের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। newsবিস্তারিত আছে এই আইনের বিধিমালায়, যেটি কার্যকর হয় ২০০৯ সালে। বিধিমালা অনুযায়ী, নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ শুরু হয় বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর।

বিধিমালার ২২ ধারায় বলা আছে, নিকাহ নিবন্ধনের আগে বিয়ে হয়েছে কি না, নিশ্চিত হতে দুই পক্ষকে নিকাহ রেজিস্ট্রার জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। কনে পর্দানশিন হলে তাঁর পক্ষে জবাব দেবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত উকিল। চাইলে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজেও বিয়ে দিতে পারেন। আবার নিকাহ রেজিস্ট্রারের উপস্থিতি ছাড়াও বিয়ে হতে বাধা নেই। এ ক্ষেত্রে বিয়ে হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ওই এলাকার যে নিকাহ রেজিস্ট্রার তাঁকে বিষয়টি জানাতে হবে। যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন, তিনি নিকাহ নিবন্ধনের জন্য রেজিস্টারে যাঁর যাঁর স্বাক্ষর প্রয়োজন, তাঁদের সঙ্গে নিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে যাবেন।

মুসলিমদের জন্য বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং নিবন্ধন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমীন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় ১৮৭৬ সালের বেঙ্গল মোহামেডান ম্যারেজেস অ্যান্ড ডিভোর্সেস অ্যাক্ট থেকে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিয়ের প্রমাণ রাখা। তবে ব্রিটিশ আমলে এই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক ছিল না। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার মুসলিমদের বিয়ে, পারিবারিক বিষয় ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের জন্য প্রথমে কমিশন অন ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি লজ গঠন করে দেয়। ১৯৬১ সালে কমিশনের সুপারিশে সরকার দ্য মুসলিম ফ্যামিলি লজ অর্ডিন্যান্স জারি করে। এই অধ্যাদেশেই বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। অধ্যাদেশটি কার্যকর করার আগেই কট্টরপন্থীদের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে। কমিশন জানায়, সংস্কারে এমন কোনো কিছু যুক্ত করা হয়নি, যা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার পেছনে যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল, তা হলো মুসলিম আইন অনুযায়ী বৈধ বিয়ে হলেও অনেক সময় বিয়ে বৈধতা বা বিয়ের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ছিল কোন এক পক্ষ অস্বীকার করার কারণে। এতে বিশেষত একজন মুসলিম বিবাহিত নারী ভরণপোষণ, দেনমোহর ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে অনেক সময় বঞ্চিত হতেন।

আয়েশা যে কারণে প্রার্থী, আইনজীবীদের যুক্তি, আদালতের রায়

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য ২০১২ সালে নিকাহ news রেজিস্ট্রার হতে প্রার্থী হন আয়েশা সিদ্দিকা। তিনি বলেন, নিকাহ রেজিস্ট্রারের যোগ্যতার যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে, তিনি তার সবগুলোই পূরণ করেছেন। সে কারণেই তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। আইনের শর্তগুলো হলো মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে নিবন্ধিত কোনো মাদ্রাসা থেকে নিকাহ রেজিস্ট্রার প্রার্থীকে আলিম সনদধারী হতে হবে, প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২১ এবং ৪৫-এর কম হতে হবে এবং তাঁকে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা হতে হবে। নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না, এমন কোনো শর্ত আইনে নেই। আইন মন্ত্রণালয় নারীদের দিয়ে বিয়ে নিবন্ধনের কাজ বাস্তবসম্মত নয় বলে সিদ্ধান্ত দেয় এবং আয়েশা সিদ্দিকা নিয়োগবঞ্চিত হন।

আয়েশা সিদ্দিকার পক্ষে আদালতে রিট করেন আইনজীবী মো হুমায়ূন কবির। তিনি গত ১৬ জানুয়ারি প্রথম আলোকে বলেন, আদালতে তাঁর যুক্তি ছিল মূলত দুটি। এক, নিকাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়া আয়েশা সিদ্দিকার সাংবিধানিক অধিকার এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, ১৯৭৪-এর কোথাও নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না, এমন কথার উল্লেখ নেই। রিটে আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হলেও আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস কোনো যুক্তিতর্কে জড়ায়নি।

তবে আয়েশা সিদ্দিকার পরিবর্তে যাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সেই সেকেন্দার আলী আইনি লড়াই করেন। তাঁর পক্ষে আদালতে দাঁড়ান আইনজীবী মহিউদ্দীন এম কাদের। তাঁর যুক্তি ছিল, দ্রুত নগরায়ণের জন্য আজকাল মসজিদে বিয়ে পড়ানোর চল হয়েছে। অনেক সময় নিকাহ রেজিস্ট্রারদের দূরদূরান্তে যেতে হয়, নৌকা করে নদী বা খাল পেরোতে হয়। বিয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই। কখনো কখনো ভোরবেলা ফজরের আজানের পরও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকে। এ রকম পরিস্থিতিতে নারী নিকাহ রেজিস্ট্রারের পক্ষে দায়িত্ব পালন বাস্তবসম্মত নয়। আরও যে যুক্তি তিনি দেখিয়েছেন, তা হলো নিকাহ রেজিস্ট্রারের মৃত্যু বা অবসরে যাওয়ার কারণে পদটি শূন্য হলে তাঁর পুত্রসন্তান যোগ্যতা থাকলে অগ্রাধিকার পাবেন।

আয়েশা সিদ্দিকার আইনজীবী হুমায়ূন কবির বলেন, অগ্রাধিকারের কথা বলা হলেও কন্যাসন্তান প্রার্থী হতে পারবেন না, সে কথা আইনে উল্লেখ নেই।
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হক আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত  newsবহাল রাখেন। তাঁরা বলেন, রিট আবেদনকারী ঠিক বলেছেন। সংবিধানে যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে জেন্ডারসমূহের সমানাধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু নিকাহ রেজিস্ট্রারের ভূমিকা ও দায়িত্ব অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মতো নয়, সেটি আলাদা এবং স্বতন্ত্র। তাঁরা বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্রাথমিক ভূমিকা ও দায়িত্ব হলো বিয়ে পড়ানো, যা মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দ্রুত নগরায়ণ এবং উন্মুক্ত স্থানের সংকট থাকায় সম্প্রতি মসজিদে বিয়ে অনুষ্ঠানের চল দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ কথা মনে রাখতে হবে, কিছু শারীরিক কারণে একজন নারী মাসের একটি নির্দিষ্ট সময় মসজিদে প্রবেশ করতে পারেন না। ওই সময়ে নারীদের প্রাত্যহিক নামাজ আদায় করতে হয় না। এই শারীরিক অযোগ্যতা নারীকে ধর্মীয় কাজের অনুমতি দেয় না।’
বিচারকেরা আরও বলেন, মুসলিম বিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় বিধিবিধান নিয়ন্ত্রিত। এতে বৈষম্যের কোনো প্রশ্ন নেই, বরং এটা বাস্তবসম্মত প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন।
কে কী বলছেন?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফওজিয়া করিম ফিরোজ হাইকোর্টের দেওয়া এই রিটের বিরুদ্ধে news আপিল করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুই যুক্তিতে হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এক, নিরাপত্তা এবং দুই, বিশেষ সময়ে মসজিদে প্রবেশ করতে না পারা। এর বিপরীতে তাঁদের যুক্তি হলো সংবিধানে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবার সমানাধিকার স্বীকৃত। তা ছাড়া বিশ্বের যেসব দেশে নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন করেন, সেসব দেশের উদাহরণ তাঁরা আদালতের কাছে উপস্থাপন করবেন। তাঁরা দেখেছেন, পাশের দেশ ভারতের হাওড়া, বোম্বে, কেরালায় মুসলিম নারী নিকাহ নিবন্ধক আছেন। মিসর, ইউরোপের একাধিক দেশেও নারীরা সফলভাবে এই দায়িত্ব পালন করছেন।

নারী অধিকার সংগঠন নারীপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, নারীর ঋতুস্রাব বিয়ের রেজিস্ট্রার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়—এই পর্যবেক্ষণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। এই রায় পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীর সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৫০ বছর আগে নারীর ভোটাধিকার নিয়ে যুক্তরাজ্যে এমন অর্বাচীন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।

তবে সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় আদালতের ওপর খুশি মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার news কল্যাণ সমিতির সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য কাজী মো. সাব্বির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যদিও নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ নিবন্ধন করা, অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা বিয়ে পড়ান। বিয়ে শুধু প্রস্তাব দেওয়া ও কবুল পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এরপর খুতবা পড়তে হয়। খুতবা পড়ার বাধ্যবাধকতা আছে কি না? কিংবা নারীরা বিয়ের খুতবা পড়তে পারবেন না, এমন কোনো ধর্মীয় বিধান আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি না সূচক জবাব দেন। তিনি বলেন, এটা রেওয়াজ, পুরুষেরাই পড়ে থাকেন।

খুশি ইসলামিক ফাউন্ডেশন মনোনীত মুফতি মো. আবদুল্লাহ বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে news রাষ্ট্রীয় আইন আর ধর্মীয় আইন একাকার হয়ে যায়। এখানে বিষয়টা তা–ই। নারীদের নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. হারুন অর

রশিদ বলেন, নারীদের ঋতুস্রাব হয়, এই যুক্তিতে তাঁকে নিকাহ রেজিস্ট্রারের পদে নিয়োগবঞ্চিত করা ঠিক না। যদি মসজিদে বিয়ে পড়ানো হয় এবং বিয়ে পড়ানোর জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রার ছাড়া আর কেউ না থাকেন, তখন বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। নারী নিকাহ রেজিস্ট্রারের বিকল্প হিসেবে তাঁর প্রতিনিধি যাবেন, বাকি কাজটুকু দাপ্তরিক। সেটা তিনি তাঁর দপ্তরে বসেই করতে পারবেন। বিকল্প সৃষ্টির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকেই সবার জন্য সমান সুযোগ করে দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here