বিদেশি বিনিয়োগ, দুর্নীতি ও জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন -news

0
148
news

আমরা অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে পড়েছি, বিদেশি কোম্পানি অনুন্নত দেশে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন পুঁজি news নিয়ে আসে। নতুন অবকাঠামো তৈরি হয়, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়, বিদেশিদের দেখাদেখি দেশি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা তৈরি হয়। সম্প্রতি দেশের বৃহত্তম পাটকল ক্রিসেন্ট আর প্লাটিনাম লিজ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল চীনা কোম্পানি। বলা হচ্ছিল, বিদেশিরা হাতে নিলে পাটশিল্পের দীর্ঘদিনের লোকসান ঘুচবে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলো পাট খাতে ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের সক্ষমতা তৈরি হয়েই আছে, news দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তৈরি হওয়া দক্ষ ও প্রশিক্ষিত লোকবল আছে এবং জনগণের করের টাকায় একটা সামগ্রিক অবকাঠামোও তৈরি হয়ে আছে। অথচ দেশীয় ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে ‘আমরা পারি না, আমরা চোর’—এই অজুহাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্পকে আমরা বিদেশিদের হাতে তুলে দেব? তার মানে আমাদের শতভাগ সক্ষমতা থাকার পরও একটা একটা করে আমাদের সব কটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, কৌশলগত খাত বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া ঠিক আছে, কারণ আমরা তো অসৎ, অদক্ষ, দুর্নীতিবাজ! স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এই আমাদের যুক্তি?

একইভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জাতীয় সক্ষমতার বহু নজির থাকার পরও বিদেশি বিনিয়োগের news নামে যে তুঘলকি অপচয় চলছে, সেটাকে কী বলা যায়? ভারত ও মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি ও পেট্রোনাস শুধু সঠিক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে মাত্র কয়েক দশকের মাথায় গভীর সমুদ্রেও তেল গ্যাস উত্তোলনে সক্ষম হয়েছে। আর আমরা কী করেছি? আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স গত কয়েক দশক ধরে হাজার হাজার লাইন কিলোমিটার সার্ভে করেছে, একের পর এক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে, অথচ আমরা বাপেক্সকে বেকার বসিয়ে রেখে বাপেক্সের আবিষ্কৃত কূপগুলোই দ্বিগুণের বেশি খরচে তুলে দিচ্ছি বিদেশি কোম্পানির হাতে! যে কাজ বাপেক্স করে ৮০ কোটি টাকায়, সেই একই কাজ সরকার গাজপ্রমকে দিয়ে করাচ্ছে ১৫৫ কোটি টাকায়! অর্থাৎ নিজস্ব সক্ষমতা থাকার পরও একগাদা বিদেশি কোম্পানি ডেকে এনে নিজের দেশের অমূল্য গ্যাসসম্পদ ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তাও আবার দ্বিগুণ খরচে? স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরে সক্ষম দেশি প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছা করে অচল রেখে এসব সর্বনাশী বিদেশি ‘বিনিয়োগ’কে আমাদের এখন ‘উন্নয়ন’ নামে ডাকতে হবে?

উন্নয়নে তুঘলকি খরচ: ট্যাক্সের টাকার কী বিপুল অপচয়!

রাস্তা নির্মাণ খাতেও চলছে নজিরবিহীন সব কাণ্ডকারখানা! বিশ্বব্যাংক (২০১৭) বিভিন্ন দেশের রাস্তা নির্মাণের খরচ তুলনা করে দেখিয়েছে বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে খরচ পড়ছে আড়াই থেকে এগারো মিলিয়ন ডলার, যা কিনা পৃথিবীর মধ্যেই নজিরবিহীন! অথচ ভারত আর চীনে রাস্তা বানাতে লাগছে মাত্র এক থেকে দেড় মিলিয়ন ডলার! এখন জিজ্ঞাসা করুন, ঢাকা-সিলেট চার লেনের খরচ কত? রংপুর-হাটিকুমরুল চার লেনের খরচ কত? এই দুই রাস্তার খরচ ছয় থেকে সাত মিলিয়ন ডলার! আবার ঢাকা-মাওয়া রুটের খরচ ধরা হয়েছে ১২ মিলিয়ন ডলার! অর্থাৎ এ দেশে রাস্তা নির্মাণের খরচ চীন আর ভারতের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি! এর মধ্যে অনেক রাস্তাই বিদেশি অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে। শুধু রাস্তাই না, ব্রিজ, টার্মিনাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেললাইন—সবই তো করছে বিদেশিরা। বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে যে সুশাসনের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা ছিল, তার ছিটেফোঁটাও হয়েছে?

মাতারবাড়ীতে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে, টাকা দিচ্ছে জাইকা, বানাচ্ছে জাপানি করপোরেশন সুমিটোমো আর তোশিবা। চুক্তি হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার! অর্থাৎ এটা দুনিয়ার সবচেয়ে খরচবহুল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র (দেখুন ‘হোয়াই শুড মাতারবাড়ী প্রজেক্ট কস্ট ৪.৪ বিলিয়ন?’ ডেইলি স্টার, ২০১৪)! পায়রাতে সমুদ্রবন্দর তৈরি হচ্ছে, টাকা দিচ্ছে বিদেশিরা, বানাচ্ছে চীনা কোম্পানি, প্রাথমিক প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা (ডলারপ্রতি ৮৪ টাকা)। এটাও এযাবৎকালে সর্বোচ্চ খরচবহুল সমুদ্রবন্দর (দেখুন ‘বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প’, প্রথম আলো, ২০১৮)! রূপপুরে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, টাকা দিচ্ছে রাশিয়ানরা, বানাচ্ছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রোসাটম, এটাও পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ খরচের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র! (তুরস্কে একই মডেলের আককুইউ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির খরচ পড়ছে আমাদের রূপপুর কেন্দ্রটির চেয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কম!) কী দেশ রে বাবা। রাস্তা, ব্রিজ, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর—যা–ই বানায়, যে–ই বানায়, দুনিয়ার সর্বোচ্চ খরচের প্রকল্প হয়ে যায়!

এই দেশে নাকি জমি অধিগ্রহণের খরচ বেশি, বিদেশি কনসালট্যান্টের ভাড়া বেশি, নদীর ঢেউ বেশি। তো অধিগ্রহণের খরচ কত বেশি? ভারত আর চীনের ৫ গুণ বেশি? তা ছাড়া শ্রমিকের মজুরি যে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম, সেই হিসাব? এই দেশে বিদেশিরা কাজ করতে গেলে যে লোকাল এজেন্টকে ‘আঙুল ফুলিয়ে কলাগাছ’ বানিয়ে বিডিংয়ে যেতে হয়, সেই হিসাব?

মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি কয়লা প্রকল্পের খরচ সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই বিলিয়ন ডলার হতে পারে, কিন্তু সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার কী করে হয়? তাঁরা বলছেন ট্রান্সমিশন লাইন, বন্দর, টার্মিনাল—সব ধরেই এই খরচ। প্রথমত, আমরা এখনো রূপপুরের বালিশ–কেলেঙ্কারির কথা ভুলে যাইনি। সামান্য বালিশের দাম যদি ২০ গুণ বেশি ধরা হয়, তাহলে বন্দর, টার্মিনাল, ট্রান্সমিশন লাইন মিলিয়ে মাতারবাড়ীর কোথায় কী হচ্ছে, সেটা জানতে চাওয়ার অধিকার আমাদের নেই? (দেখুন ‘মাতারবাড়ী পাওয়ার ডাজেন্ট বদার টু ডিজক্লোজ ১০,০০০ ক্রোর কস্ট হাইক’, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০১৯।) জনগণ বছর বছর ঋণের পাহাড় শোধ করবে অথচ জানবে না প্রকল্পের খরচ ৩৬ হাজার কোটি টাকা কী করে হলো? এ ছাড়া পৃথিবীর সর্বোচ্চ খরচে আমরা আসলে কী বানাচ্ছি? সর্বোচ্চ দূষণকারী প্রকল্প? গ্রিনপিসের ২০১৯ সালের রিপোর্ট দেখাচ্ছে, জাপানের সুমিতামো বাংলাদেশে যে ধরনের নিম্নমানের কয়লা প্রকল্প বানানোর অনুমোদন পাচ্ছে, জাপানের নিজের মাটিতে সেই ধরনের দূষণকারী প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়াই সম্ভব না (দেখুন জাপান’স ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, গ্রিনপিস, ২০১৯।)

পায়রা বন্দরের অবিশ্বাস্য খরচের কথা উঠলেই বলা হয়, খরচ তো হবেই, নদীর নাব্যতা কম, ১৮ মিটার গভীরতায় ড্রেজিং করতে হবে, ৪০ কোটি ঘনমিটার বালু সরাতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু এই বিশাল প্রকল্পে হাত দেওয়ার আগে আগে ‘ফিজিবিলিটি’ (সম্ভাব্যতা) সমীক্ষা করা হয়নি? জার্মান ভূতত্ত্ববিদ হারমান কুডরাস তো প্রথম থেকেই বলে আসছেন এই ‘লোকেশন’ বন্দর নির্মাণের উপযোগীই নয় (দেখুন ‘বিল্ডিং পায়রা ডিপ সি হারবার, আ চ্যালেঞ্জ অব নেচার’, ২০১৭।) কুডরাসের মতে, বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের গভীরতায় টানা ড্রেজিং করে যাওয়া এক কিম্ভূতকিমাকার খরচের ব্যাপার। তার মানে দেখা যাচ্ছে, কস্ট অ্যান্ড বেনিফিট অ্যানালাইসিস (লাভ–ক্ষতির সমীক্ষা) নামের কিছু নেই আমাদের অভিধানে? বিশেষজ্ঞরা নিষেধ করার পরও পৃথিবীর সর্বোচ্চ খরচে আমরা একটা আস্ত বন্দর তৈরি করে ফেললাম? বরাদ্দের টাকা কিন্তু আকাশ থেকে পড়ে না। এই বিপুল ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে এসে পড়ে? জনগণের করের টাকায় নির্মিত এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কোন গোষ্ঠীর পকেট ভরে?
দূষণকারী ‘উন্নয়ন’ প্রকল্প: লাভ কার?
প্রশ্ন করুন, সব কটি কয়লা প্ল্যান্টের সঙ্গে একটা করে কয়লা টার্মিনাল বানাতে হচ্ছে কেন? news পায়রাতেও কয়লা টার্মিনাল, মাতারবাড়ীতে কয়লা টার্মিনাল, আবার মহেশখালীতে কয়লা টার্মিনাল? এত এত কয়লা টার্মিনাল দিয়ে কী করবে বাংলাদেশ? ঠিক কত কয়লা দরকার বাংলাদেশের? সারা দুনিয়া যখন স্মার্ট জ্বালানি পলিসি নিয়ে এগোচ্ছে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে কয়লা থেকে সরে আসার ঘোষণা দিচ্ছে, সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের খরচ যখন অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে কমছে, তখন আমরা বানাচ্ছি ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অদ্ভুতুড়ে খরচের সব কয়লা টার্মিনাল, কয়লা জেটি, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র? (দেখুন ‘চোকড বাই কোল: দ্য কার্বন ক্যাটাস্ট্রফি ইন বাংলাদেশ’, মার্কেট ফোর্সেস, ২০১৯।)

আসল কথা হলো বিপুল খরচে নির্মিত আমাদের কয়লা প্রকল্পগুলোয় লাভজনক রাখতে বছরের পর বছর ধরে বিদেশি কয়লার চালান আসতে হবে। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বায়ুবিদ্যুতে বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরেও (দেখুন ‘এসেসিং দ্য উইন্ড এনার্জি পটেনশিয়াল ইন বাংলাদেশ’, ইউএসএইড, ২০২০) এবং বায়ুবিদ্যুতের খরচ কয়লার তুলনায় অনেক কমে এলেও প্রতিবছর ১৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করে সুদূর ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা বয়ে নিয়ে আসতে হবে আমাদের (মার্কেট ফোর্সেস, ২০১৯)। বিকল্প থাকার পরেও এসব বাড়তি খরচের ফাঁদে আমরা কী করে পড়লাম? পড়লাম কারণ সারা দুনিয়া যখন সৌর আর বায়ুতে বিনিয়োগ করছে, আমরা তখন বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণ নিয়ে একের পর এক কয়লা প্ল্যান্ট বানিয়ে বসে আছি। অপ্রয়োজনীয় এবং দূষণকারী এসব বিদেশনির্ভর প্রকল্পকে লাভজনক রাখতে এক ভয়ংকর কয়লাচক্রের মধ্যে আটকে গেছে আমাদের জ্বালানি খাত।

বিদেশি কোম্পানি বনাম জাতীয় সক্ষমতা: কার লাভ, কার ক্ষতি?
বাংলাদেশ হচ্ছে সেই দেশ, যে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরবর্তী কয়েক দশকের জাতীয় news পরিকল্পনা করে দেওয়ার জন্য ভাড়া করা হয়েছে একটি বিদেশি কোম্পানিকে। টেপকো নামের এই জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনাটি বানিয়ে দিয়েছে, দেশের কোথায় কয়লাবিদ্যুৎ হবে, কোথায় কয়লা টার্মিনাল হবে, কোথায় এলএনজি টার্মিনাল হবে—এসব বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে, এবং তারপর নিজেরাই নির্মাণকাজের ‘কনসালট্যান্ট’ হয়ে বসে আছে, আর নিজেরাই পরিবেশ সমীক্ষা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইত্যাদি তৈরি করে রায় দিয়ে দিচ্ছে! কী কাণ্ড! ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ (স্বার্থের সংঘাত) নামের কোনো জানাবোঝা নেই আমাদের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের? সবচেয়ে বড় কথা, জাপানি কোম্পানির তৈরি করে দেওয়া মাস্টার প্ল্যানে দেশের জ্বালানি খাতে জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের কোনো চিন্তাভাবনা তো নেই–ই, বরং আগামী কয়েক দশকের জন্য আমাদের জ্বালানি খাতকে বিদেশি এলএনজি, বিদেশি নিউক্লিয়ার আর বিদেশি কয়লার ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করার সব বন্দোবস্তই করা আছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে পরেও চীনা কোম্পানি, কোরীয় প্রকৌশলী ছাড়া আমরা নাকি রাস্তা, news কালভার্ট, বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাতে পারি না! নাকি বানাতে দেওয়া হয় না? জাইকার বিনিয়োগে যেসব প্রকল্প হয়, সক্ষম লোকাল প্রতিষ্ঠান ‘বিড’ করার পরও চীন, জাপান বা কোরিয়ার কোম্পানিকে কৌশলে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ বড় প্রকল্পগুলোর অনুমোদন পাওয়ার পর কটা বিদেশি কোম্পানি এ দেশের মাঠেঘাটে নেমে নির্মাণের কাজ করে? বাস্তবে বিদেশি কোম্পানি চুক্তি সই করে, আর সাবকন্ট্রাক্টর হয়ে মাঠের কাজ করেন দেশের প্রকৌশলীরা। মাতারবাড়ী ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালী ও পায়রা টার্মিনাল, পদ্মা সেতু আর পদ্মা রেল লিংকসহ বেশির ভাগ প্রকল্পেই সাবকন্ট্রাক্টর হয়ে কাজ করছে লোকাল প্রতিষ্ঠান। শুনে আশ্চর্য হতে হয়, গাজপ্রমের বেশির ভাগ কাজ করে দেয় আমাদের বাপেক্সের প্রকৌশলীরা। স্বাভাবিকভাবেই অনেক কম খরচে।

অথচ অবিশ্বাস্য সব খরচের ‘ডিলিং’ হচ্ছে বিদেশিদের সঙ্গে। শুধু রড, বালু, সিমেন্টের খরচ news বেশি বেশি দেখিয়ে, অথবা রডের বদলে প্রচুর পরিমাণ বাঁশ ব্যবহার করে তো আর ৫ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি হিসাব মেলানো সম্ভব না? তাহলে?
আসলে সব কটি বিদেশি কোম্পানির যে একটি করে লোকাল এজেন্ট আছে, এটুকু আমরা news সবাই জানি। আর অভাবনীয় মোটা অঙ্কের কমিশন খাওয়ার জন্যই যে তাদের জন্ম হয়, সেটাও সবাই জানি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই লোকাল এজেন্ট কারা এবং তারা কাদের ‘মেন’? জনগণের করের টাকায় এসব অস্বাভাবিক খরুচে প্রকল্পের চুক্তি হবে, মাঝখান থেকে অমুকের ‘ম্যান’ তমুকের ‘ম্যান’ মিলে ভাগবাঁটোয়ারা হবে, আর কয়েক প্রজন্ম ধরে বিদেশি ঋণ তিলে তিলে শোধ করবে এই দেশের সাধারণ মানুষ? তার মানে একে তো আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে তাদের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না, তারা কাজের সুযোগও পাচ্ছে না, আরেক দিকে বিদেশি কোম্পানিই প্রকল্পের কাজ পাচ্ছে, কনসালট্যান্সি করছে, পরিকল্পনা করছে, অথচ দেশীয় এজেন্টদের প্রবল প্রতাপে খরচের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

বিদেশি বিনিয়োগ, দুর্নীতি ও প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়ন

বিদেশি কোম্পানি অলস পুঁজি নিয়ে বসে থাকে। তার খোঁড়াখুঁড়ি করার মতো নতুন সম্পদ দরকার। news ব্রিজ, কালভার্ট, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার বানানোর মতো নতুন নতুন অঞ্চল দরকার। যেখানে তেল আছে, কয়লা আছে, সমুদ্রের নিচে গ্যাস আছে, মাটির ওপরে পাটকল–চিনিকল যন্ত্রপাতিসমেত পড়ে আছে, এবং সর্বোপরি যেখানে দুর্নীতি বা অস্বচ্ছ চুক্তির স্বাভাবিকায়ন হয়েছে, বিদেশি কোম্পানি সেখানে হানা দেবেই। বেশি বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হলেই যদি দেশের চেহারা পাল্টে যেত, তাহলে গত কয়েক দশকের এত এত ইউরোপীয় আর চীনা বিনিয়োগের পরও নাইজেরিয়া, এঙ্গোলা বা গ্যাবন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশগুলোর কাতারে কেন? বিদেশি তেল কোম্পানির বিনিয়োগের আখড়া নাইজেরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ কেন?
মোটাদাগে বলা যায়, বিদেশি বিনিয়োগ হলে দেশের মানুষের ‘উন্নয়ন’ হতেও পারে, নাও হতে পারে। পুরোটাই নির্ভর করে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির চর্চা, পলিসির স্বচ্ছতা ও সুশাসনের ওপর। আবার বিদেশি কোম্পানি ঢুকলে দুর্নীতি কম হবে, লোকসানি মিল লাভ করবে, প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এসব বইপড়া বিদ্যা প্রচার করেন যাঁরা, তাঁরা ভুলে গেছেন, এ মুহূর্তে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কোম্পানি, বিদেশি কন্ট্রাক্টর, বিদেশি বিশেষজ্ঞ, বিদেশি প্রকৌশলী কাজ করছেন এই দেশে। কমেছে ঘুষ, দুর্নীতি? কমেছে কমিশন–বাণিজ্য, ‘স্পিড মানি’? কমেছে রাস্তার খরচ? কমেছে বেকারত্ব? অর্থাৎ পুরো সিস্টেমই যখন দুর্নীতির সহায়ক, সরকারি, বেসরকারি, রাশিয়ান, চীনা, কোরীয়—সবাই তখন সেই অসৎ সিস্টেমের সুবিধাভোগী। আর জাতীয় সক্ষমতা তৈরির যেকোনো সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে এই পুরো চক্রই তখন সক্রিয়।

পরিশেষ: খরুচে ‘উন্নয়ন’ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন

ঠিক এ ধরনের একটি অসৎ সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখতে বা রক্ষা করতেই প্রয়োজন পড়ে লাগাতার news রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের। এ রকম একটি ‘এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই’ পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক খরচে সব দেশি–বিদেশি প্রকল্পের মাধ্যমে যাদের ব্যাপক ‘উন্নয়ন’ হয়, তারা এই লাগামহীন লুটপাটের সুযোগ এবং স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়বে কেন? এখানে অর্থনীতি চলে গেছে বড় মাফিয়াদের হাতে, অস্বাভাবিক খরচের স্বাভাবিকায়ন হয়েছে এবং রাষ্ট্র, সরকার ও লুটেরা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী মিলেমিশে একাকার হয়েছে। তাই জনগণ এসবের প্রতিবাদ করলে তারা মামলা করবে না কেন? রিমান্ডে নেবে না কেন? জেলে ঢোকাবে না কেন? ফলাফলস্বরূপ আমরা দেখি, কখনো পুলিশ দিয়ে, কখনো নতুন নতুন আইন তৈরি করে, জেল–জুলুম–নিপীড়নের মাধ্যমে দুর্নীতির সমালোচকদের শাস্তি দেওয়া হয়। ফলাফলস্বরূপ আমরা দেখি, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর নিজের দেশের news প্রতিটি সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে এই লাভের গুড়ের ‘উন্নয়ন’কে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here