নিহতের সংখ্যা কত, ১৩, ১৫ না ১৬

0
39
news

রাজধানীর রায়েরবাগে একটি স্কুলব্যাগের কারখানায় কাজ করতেন আশিকুল ইসলাম (৩২)। চাকরি হারিয়ে দুই মাস আগে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড় আশিকুল হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছিলেন। এর মধ্যেই গত ২৮ মার্চ সকালে হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালে পিকেটিং করতে বাড়ির পাশের পৈরতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যান আশিকুল। দুপুর ১২টার দিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

আশিকুলের বাড়িতে গেলে গত রোববার তাঁর মা শামসুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, গুলিটা আশিকুলের মাথায় লাগে। তাঁর সঙ্গে থাকা এলাকার লোকজন বলেছেন, পুলিশ গুলি ছুড়েছিল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৬ থেকে ২৮ মার্চ টানা তিন দিনের সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের একজন এই আশিকুল ইসলাম। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই তিন দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। তবে সরকারি তালিকায় আশিকুলের নাম নেই।

এ ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের করা নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় আশিকুলের নাম রয়েছে। হেফাজত বলছে, আশিকুলসহ মোট ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ১২ জনের নাম সরকারি তালিকায়ও আছে। তিনজনের নাম সরকারি তালিকায় নেই। আবার সরকারি তালিকায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে নুরুল আমিনের (২২) নাম হেফাজতের তালিকায় নেই। এ অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা ১৩, ১৫ না ১৬, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

হেফাজত যে ১৫ জনের তালিকা দিয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৬ জনের নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডের রেজিস্টার খাতা ও মৃত্যুর কারণবিষয়ক চিকিৎসা সনদে রয়েছে। তাঁরা হলেন বাদল মিয়া (২৮), জহিরুল ইসলাম (৪০), কাউসার আহমেদ (২২), আল আমিন (১৯), মো. জুবায়ের (১২) ও কাউছার আহমেদ (২০)। শেষের তিনজনের চিকিৎসা সনদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা লেখা আছে।

এর বাইরে আহত অবস্থায় দুজনকে ঢাকা ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তাঁরা মারা যাওয়ার পর সেখানে দুজনেরই লাশের ময়নাতদন্ত হয়। তাঁরা হলেন আবদুল্লাহ রাতিন (১৫) ও কামাল মিয়া (২১)।

বাকি সাতজনের পরিবারের সঙ্গে এই প্রতিবেদকেরা কথা বলেন। পরিবারগুলো মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত করে।

সরকারের তালিকায় বিভ্রাট

নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে মাঠ প্রশাসন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে তালিকা পাঠানো হয়, তাতে ১৩ জনের নাম, ঠিকানা ও পেশা উল্লেখ রয়েছে। ‘ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত হেফাজতের মৃত্যুবরণকারীদের নামের তালিকা’ অনুযায়ী তিন দিনে প্রাণ হারিয়েছেন রাজমিস্ত্রি মো. আশিক (২০), সিএনজিচালক জোর আলম (৪০), সিএনজিচালক সুজন (২০), প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক বাদল (২৮), কাঁচামালের ব্যবসায়ী কাউছার (৩০), দারুল আরকাম মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র হাফেজ মো. জোবায়ের (১৪), জামিয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার আদব বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ হোসাইন (২৭), সরাইল পাঠানপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র মো. আলামিন (১৯), রিকশাচালক লিটন (৩০), শ্রমিক কামালুদ্দিন (৩২), তাবলিগ জামাতের সাথি কালন মিয়া (৪০), কাপড়ের দোকানের কর্মচারী মো. রাতিম (২২) ও শ্রমিক নুরুল আমিনের (২২)।

সরকারি তালিকায় পাঁচজনের সঠিক নাম উল্লেখ করা হয়নি। তাঁদের মধ্যে জোর আলমের প্রকৃত নাম জহিরুল ইসলাম, সুজনের প্রকৃত নাম হাফেজ কাউসার আহমেদ, মোহাম্মদ হুসাইনের প্রকৃত নাম হুসাইন আহমেদ, কামালুদ্দিনের প্রকৃত নাম কামাল মিয়া এবং মো. রাতিমের প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ রাতিন বলে তাঁদের পরিবার প্রথম আলোকে জানিয়েছে।

সরকারি তালিকায় নুরুল আমিনের বাবার নাম মাদু মিয়া উল্লেখ করা হয়। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুর। এই তথ্য ধরে প্রথম আলো নন্দনপুরের পাঁচজন বাসিন্দা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন। সহিংসতায় এলাকার নুরুল আমিন নামে কেউ মারা গেছেন বলে তাঁরা শোনেননি বলে জানিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি আবদুর রহিমও বলেছেন, নুরুল আমিনের কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ ও জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি) থেকে যে তথ্য এসেছে, তা ধরেই এই তালিকা করা হয়েছে। এঁদের সবারই মৃত্যু হয়েছে সংঘর্ষে।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশের বিশেষ শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডিআইও-১) ইমতিয়াজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এই তালিকা কারা, কীভাবে করেছে, তা তাঁর জানা নেই।

সরকারি তালিকার বাইরে যাঁরা

সরকারের তালিকায় যে ১৩ জনের নাম রয়েছে, তাঁদের মধ্যে নুরুল আমিন ছাড়া বাকি ১২ জনের নাম হেফাজতে ইসলামের তালিকায়ও আছে। হেফাজতের তালিকায় থাকা মো. মোশাহিদ মিয়া (১৮), মো. আশিকুল ইসলাম (৩২) ও মো. ফয়সালের (১৭) নাম সরকারের তালিকায় নেই।

তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে মোশাহিদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শিমরাইলকান্দিতে। গত রোববার সকালে সেই বাড়িতে কথা হয় তাঁর বাবা নূর আলমের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২৭ মার্চ জামেয়া ইউনুসিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের খবর পেয়ে তাঁর ছেলে সেখানে যান। সন্ধ্যা সাতটা-সাড়ে সাতটার দিকে মোশাহিদ পেটে গুলিবিদ্ধ হন। গুলি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অ্যাম্বুলেন্সে করে মোশাহিদকে ঢাকায় নেওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জে তাঁর মৃত্যু হয়।

একই দিন শহরের বাইরে গোকর্ণ ঘাটে আশিকুলের বাড়িতে গেলে তাঁর মা শামসুন নাহার দাবি করেন, তাঁর ছেলে শহীদ হয়েছেন। তিনি এ নিয়ে মামলা করতে চান না।
মুঠোফোনে কথা হয় ফয়সালের বড় ভাই আনার মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর বাবার নাম মোবারক মিয়া, মা সোফিয়া খাতুন। ফয়সাল নন্দনপুরে একটি দরজির দোকানে কাজ করতেন। ২৭ মার্চ নন্দনপুরে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় ফয়সালও সেখানে ছিলেন। আসরের নামাজের পর পুলিশের গুলিতে ফয়সাল মারা যান।

এই প্রতিবেদকেরা নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মোট ১৫ জনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। প্রত্যেকের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তাঁরা গুলিতে মারা গেছেন। খুন, সংঘাত, দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যুর ঘটনায় সাধারণত থানায় মামলা হয়ে থাকে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের কারও বিষয়ে থানায় মামলা হয়নি। এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আনিছুর রহমান কিছু বলতে রাজি হননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, নিহত ব্যক্তিদের বিষয়ে কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই। থানায় কেউ মামলা করতে আসেননি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক এ কে এম শিবলি বলেন, ‘কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আবার হেফাজতে ইসলামের সহিংস আন্দোলনও সমর্থনযোগ্য নয়। আবার গুলি করে মেরে ফেলাও সমর্থন করি না।’

(শেষ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here